Ticker

6/recent/ticker-posts

মেরাজ সম্পর্কে আকীদা


 মেরাজ সম্পর্কে আকীদা

Sayeed Abdul Qayum Al-Hossainy

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হিজরতের এক বা দেড় বছর পূর্বে এক মহিমান্বিত রাতে মক্কার মসজিদে হারাম হতে জেরুজালেমের বায়তুল মুকাদ্দাস বা মসজিদে আকসায় ভ্রমনকে ইসরা এবং সেখান থেকে উর্ধ্বগমনকে মে'রাজ বলা হয়েছে। এটা রাসুলুল্লাহ স্বাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য আল্লাহর পক্ষ হতে উপহার ও মু'জিযা। মে'রাজ অন্য কোনো নবীর বৈশিষ্ট্য নয়। এটা তাঁর উম্মাতের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মে'রাজ জাগ্রত অবস্থায় এবং স্বশরীরে হয়েছে।


মুসলমানদের আক্বিদার সবচেয়ে প্রসিদ্ধ কিতাব "আকীদাতুত তহাবী" তে ইমাম তহাবী (রহ.) লিখেছেন,

ﻭَﺍﻟْﻤِﻌْﺮَﺍﺝُ ﺣَﻖٌّ، ﻭَﻗَﺪْ ﺃُﺳْﺮِﻱَ ﺑِﺎﻟﻨَّﺒِﻲِّ ﺻَﻠَّﻰ ﺍﻟﻠّٰﻪُ ﻋَﻠَﻴْﻪ ﻭَﺳَﻠَّﻢ ﻭَﻋُﺮِﺝَ ﺑَﺸَﺨْﺼِﻪٖ ﻓِﻲ ﺍﻟْﻴَﻘْﻈَﺔ ِﺇِﻟٰﻰ ﺍﻟﺴَّﻤَﺎﺀِ، ﺛُﻢَّ ﺇﻟٰﻰ ﺣَﻴﺚُ ﺷَﺎﺀَ ﺍﻟﻠّٰﻪُ ﺗﻌﺎﻟٰﻰ ﻣِﻦَ ﺍﻟﻌُﻼ، ﻭَﺃَﻛْﺮَﻣَﻪُ ﺍﻟﻠّٰﻪُ ﺗَﻌَﺎﻟٰﻰ ﺑِﻤَﺎﺷَﺎﺀَ، ﻓﺄﻭْﺣٰﻰ ﺇﻟٰﻰ ﻋَﺒﺪِﻩٖ ﻣَﺎ ﺃَﻭْﺣٰﻰ

অর্থাৎ "মে'রাজ সত্য। হযরত নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রাতের বেলায় মসজিদে আকসা ভ্রমণ (ইসরা) করানো হয়েছে এবং তাঁকে জাগ্রত অবস্থায় স্বশরীরে নভোমণ্ডলে উঠানো হয়েছে। অতঃপর আল্লাহ তাআলা যেখানে চেয়েছেন সেখানেই নিয়েছেন। তিনি নাবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যা দিয়ে সন্তুষ্ট করতে চেয়েছেন তা দিয়েই সম্মানিত করেছেন। এবং যা ওহী করার ইচ্ছা তাই ওহী করেছেন।" [আকীদাতুত তহাবী]

.

রাসুলুল্লাহ স্বাল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ কে দেখেছেন লামাকায় অর্থাৎ কোনো স্থান ছাড়া। মেরাজে প্রিয় নবি স্বাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিরাকার আল্লাহ কে সময়-কাল ছাড়া, স্থান-দুরত্ব-দিক ছাড়াই কিভাবে দেখলেন? এ প্রশ্ন জাগলে। আসুন দেখি ক্বুরয়ান কি বলে। 

আল্লাহ সূরা আন-নাজম:১১ এ বলেন - "রাসূলের অন্তর মিথ্যা বলেনি যা সে দেখেছে।" অর্থাৎ রাসুল স্বাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ কে দেখেছেন অন্তর এবং চোখ এ দুই এর সাহায্যে কেননা নিরাকার জিনিস আমাদের এই চোখ দেখতে পারেনা। এখন তিনি কিভাবে দেখলেন তা আল্লাহ এবং তার রাসুল স্বাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভাল জানেন। এ বিষয়ে আর চিন্তার দরকার নেই। কেননা রাসুল স্বাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন লা ফিকরাতা ফিররাব; তোমরা আল্লাহ কে নিয়ে বেশি ভাবিও না, পথভ্রষ্ট হবে। বরং তার সৃষ্টিকে নিয়ে চিন্তা কর।

ইমামে আযাম আবু হানিফা রাঃ বলেছেনঃ অর্থাৎ "তুমি যখন যখন তোমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে আল্লাহ কে চিন্তা করবে তখনি আল্লাহ কে তার উর্ধ্বে পাবে।" সুবহান আল্লাহ। আমাদের মস্তিষ্ক বানানো হয়েছে আকার-আকৃতি ও সসীম বস্তুকে নিয়ে চিন্তার জন্য। কিন্তু আল্লাহ তো অসীম। তাই আল্লাহ কে আমরা নিজের সসীম মস্তিস্কে ধারন করতেই পারবো না।

.

ইমাম আবু হানিফা রহ. ফিক্বহুল আকবারে স্পষ্ট লিখেছেনঃ আল্লাহ তায়ালা দিক থেকে পবিত্র। পরকালে আল্লাহ তায়ালাকে দেখা যাবে। কিন্তু আল্লাহ তায়ালাকে দেখার জন্য আল্লাহর কোন দিকে থাকার প্রয়োজন নেই।

.

ইসরা ও মে'রাজ অস্বীকারকারীর ব্যাপারে শরীআতের ফয়সালাঃ

"ইসরা" তথা মসজিদে হারাম হতে মসজিদে আকসা পর্যন্ত ভ্রমণ বা ইসরা কুরআন দ্বারা সাব্যস্ত। (সূরা বনী ইসরাঈলের শুরুতে এ ব্যাপারে বলা হয়েছে)। সুতরাং এটা অস্বীকারকারী কাফির।

মসজিদে আকসা হতে প্রথম আসমান পর্যন্ত মে'রাজ হাদীসে মাশহুর দ্বারা প্রমাণিত। এর অস্বীকারকারী ফাসেক।

প্রথম আসমান হতে সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত হাদীসে আহাদ দ্বারা প্রমাণিত। এর অস্বীকারকারী ফাসেক। [তাফসীরে আহমাদী]

.

সূরা আন-নাজমের এক আয়াতের অর্থ ভুল বুঝে কিছু মানুষ নিজে পথভ্রষ্ট হয় এবং অনান্যদেরও গুমরাহ করে। আল্লাহ সুরা নাজমের ৯ নং আয়াতে এরশাদ করেন: "তখন দুই ধনুকের ব্যবধান ছিল অথবা আরও কম।" এ আয়াতকে কিছু মানুষ আল্লাহ ও তার রাসুলের জন্য নির্ধারণ করে মনে করে যে এই আয়াত আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের সাক্ষাতের ব্যাপারে বর্ণিত হয়েছে, কিন্তু এই বিশ্বাস ঠিক নয়। কেননা এই আয়াত রাসুলুল্লাহ স্বাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও জিবরীল আঃ কে নিয়ে বর্ণিত হয়েছে। তার প্রমান পেতে আপনি এই সুরার প্রথমের আয়াতগুলি পড়ুন। 

আল্লাহ বলছেন সূরা আন-নাজম:৫-৬ঃ "তাঁকে শিক্ষা দান করে আল্লাহর পক্ষ থেকে এক শক্তিশালী ফেরেশতা, সহজাত শক্তিসম্পন্ন, সে নিজ আকৃতিতে প্রকাশ পেল।" এখানে জিবরীল আঃ নিজ প্রকৃত আকৃতিতে প্রকাশ পেলেন। এ কথাই বলা হয়েছে। এই আয়াত আল্লাহ দিকে সম্ভোধন করলে ঈমানহারা হতে হবে। কেননা আল্লাহর জন্য স্থান, দুরত্ব ইত্যাদি বিশ্বাস করাটাই কুফরি। 

.

অনেকের মনেই প্রশ্ন আসতে পারে যে যেহেতু রাসুলুল্লাহ স্বাল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়াসাল্লাম মেরাজে উপরে আকাশে গিয়েছেন। তাহলে আল্লাহ কি উপরে মানে আকাশে বা আরশে থাকেন? 

না। আল্লাহ জায়গা ছাড়াই উপস্থিত। আল্লাহ সুরা বনি ইসরাইল ১ নং আয়াতে বলেন لِنُرِیَہٗ مِنۡ اٰیٰتِنَا ؕ অর্থাৎ তার নিদর্শনাদি দেখানোর জন্য। আল্লাহ তার রাসুলকে নিজের নিদর্শনাবলী দেখানোর জন্য আসমানে নিয়ে গিয়েছেন। জাহান্নাম হলো সাত জমিন নিচে কিন্তু আল্লাহ রাসুলুল্লাহ স্বাল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়াসাল্লাম কে জাহান্নাম আকাশ থেকেই দেখালেন। আল্লাহ কুরয়ানে বলেন,

اِنَّ اللّٰہَ عَلٰی کُلِّ شَیۡءٍ قَدِیۡرٌ ﴿۲۰﴾

অর্থ আল্লাহ সব কিছুই করতে সক্ষম। তাই যে আল্লাহ সাত জমিনের নিচের জাহান্নাম কে সাত আসমান উপরে দেখাতে পারেন সেই আল্লাহ নিজের সত্তাকে কোনো দিক ছাড়াও দেখাতে সক্ষম, আলহামদুলিল্লাহ। এনিয়ে আর চিন্তার প্রয়োজন নেই।

.

সমস্ত মুসলমানএর আকিদা হলো, আল্লাহ

তায়ালা স্থান ও দিক থেকে পবিত্র। কোন কিছু সৃষ্টি করার পূর্বে যেমন আল্লাহ তায়ালা কোন স্থানে অবস্থান ব্যতীত ছিলেন, এখনও তিনি আছেন। আসমান-জমিন ধ্বংসের পরেও আল্লাহ তায়ালা থাকবেন। আল্লাহ তায়ালাকে কোন স্থানে বা দিকে বিশ্বাস করা গোমরাহী।


হযরত আলী رضي الله عنه আরও বলেন,

“ ﻛﺎﻥ ـ ﺍﻟﻠﻪ ـ ﻭﻻ ﻣﻜﺎﻥ، ﻭﻫﻮ ﺍﻵﻥ ﻋﻠﻰ ﻣﺎ ـ ﻋﻠﻴﻪ ﻛﺎﻥ ”

অর্থ: যখন কোন স্থান ছিলো না, তখনও আল্লাহ তায়ালা ছিলেন। তিনি এখনও স্থান থেকে পবিত্র অবস্থায় আছেন। [আল-ফারকু বাইনাল ফিরাক, আবু মনসুর বাগদাদী, পৃ ৩৩৩]

হযরত আলী رضي الله عنه আরও বলেন,

“ ﺇﻥ ﺍﻟﻠﻪ ﺗﻌﺎﻟﻰ ﺧﻠﻖ ﺍﻟﻌﺮﺵ ﺇﻇﻬﺎﺭًﺍ ﻟﻘﺪﺭﺗﻪ ﻻ ﻣﻜﺎﻧًﺎ ﻟﺬﺍﺗﻪ ”

অর্থ: আল্লাহ তায়ালা নিজের কুদরত প্রকাশের জন্য আরশ সৃষ্টি করেছেন, নিজ সত্ত্বার স্থান হিসেবে নয়।” [আল-ফারকু বাইনাল ফিরাক, আবু মনসুর বাগদাদী, পৃ.৩৩৩]

.

বিখ্যাত তাবেয়ী ইমাম যাইনুল আবেদীন [ইন্তেকাল ৯৪ হি:] বলেন,

“ ﺃﻧﺖ ﺍﻟﻠﻪ ﺍﻟﺬﻱ ﻻ ﻳَﺤﻮﻳﻚ ﻣﻜﺎﻥ ”

অর্থ: হে আল্লাহ, আপনি সেই সত্ত্বা, কোন স্থান

যাকে পরিবেষ্টন করতে পারে না। [ইতহাফুস সাদাতিল মুত্তাকিন, আল্লামা মোর্তজা জাবিদী, খ.৪, পৃ.৩৮০]

তিনি আরও বলেন,

“ ﺃﻧﺖ ﺍﻟﻠﻪ ﺍﻟﺬﻱ ﻻ ﺗُﺤَﺪُّ ﻓﺘﻜﻮﻥَ ﻣﺤﺪﻭﺩًﺍ ”

অর্থ: আপনি সেই সত্ত্বা যার কোন হদ বা সীমা

নেই। সীমা থাকলে তো আপনি সসীম হয়ে যাবেন। [ইতহাফুস সাদাতিল মুত্তাকিন, খ.৪, পৃ.৩৮০]।

ইমাম আবু হানিফা রহ. তার আল-ফিকহুল আবসাতে বলেছেন,

“: ﻗﻠﺖُ : ﺃﺭﺃﻳﺖَ ﻟﻮ ﻗﻴﻞ ﺃﻳﻦ ﺍﻟﻠﻪ ﺗﻌﺎﻟﻰ؟ ﻓﻘﺎﻝ ـ ﺃﻱ ﺃﺑﻮ ﺣﻨﻴﻔﺔ ـ : ﻳﻘﺎﻝ ﻟﻪ ﻛﺎﻥ ﺍﻟﻠﻪ ﺗﻌﺎﻟﻰ ﻭﻻ ﻣﻜﺎﻥ ﻗﺒﻞ ﺃﻥ ﻳﺨﻠﻖ ﺍﻟﺨﻠﻖ، ﻭﻛﺎﻥ ﺍﻟﻠﻪ ﺗﻌﺎﻟﻰ ﻭﻟﻢ ﻳﻜﻦ ﺃﻳﻦ ﻭﻻ ﺧَﻠْﻖ ﻭﻻ ﺷﻰﺀ، ﻭﻫﻮ ﺧﺎﻟﻖ ﻛﻞ ﺷﻰﺀ ”

অর্থ: যদি আপনাকে প্রশ্ন করা হয় আল্লাহ তায়ালা কোথায়? ইমাম আবু হানিফা রহ. এর উত্তরে বলেন, তাকে জিজ্ঞাসা করা হবে, সৃষ্টির অস্তিত্বের পূর্বে, যখন কোন স্থানই ছিলো না, তখনও আল্লাহ তায়ালা ছিলেন। আল্লাহ তায়ালা তখনও ছিলেন যখন কোন সৃষ্টি ছিলো না, এমনকি ‘কোথায়’ বলার মতো স্থানও ছিলো না। সৃষ্টির একটি পরমাণুও যখন ছিলো না তখনও আল্লাহ তায়ালা ছিলেন।

তিনিই সব কিছুর সৃষ্টা” [ আল-ফিকহুল আবসাত, পৃ.২০,]।

#আলহামদুলিল্লাহ। আশা করি #মেরাজ সম্পর্কে আপনাদের একটি সুস্পষ্ট ধারনা হয়েছে। আল্লাহ আমাদের হক্ব কথা জানার ও প্রচার করার তাওফিক দান করুন।



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ